অভিনন্দন বাংলাদেশ :আফ্রিকাকে হারিয়ে উড়ন্ত সূচনা, ২০১৯ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছে

রবিবার, জুন ২, ২০১৯ ৫:৩২ অপরাহ্ণ

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে টাইগাররা যাত্রা শুরু করে। বিশ্বকাপের মিশনটা জয় দিয়েই শুরু করলো বাংলাদেশ। প্রোটিয়াদের ৩৩১ রানের টার্গেট ছুঁড়ে দিয়ে ৩০৯ রানে থামিয়ে দেয় লাল-সবুজের দলটি। তাতে ২১ রানের জয় সঙ্গী করে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে নামবে টাইগাররা। আগামী ৫ জুন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মুশফিকরা।

টস জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন প্রোটিয়া দলপতি ফাফ ডু প্লেসিস। সৌম্য, তামিমের উড়ন্ত ওপেনিং জুটির পর মুশফিক-সাকিবের দুর্দান্ত পার্টনারশিপে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তোলে ৩৩০ রান। শেষ দিকে মাহমুদউল্লাহ-মোসাদ্দেক দ্রুতগতিতে রান তুলেছেন। তাতে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ দাঁড় করায় টাইগাররা। বিশ্বকাপে এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের সংগ্রহ। এর আগে গত বিশ্বকাপে নেলসনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে টাইগাররা তুলেছিল ৩২২ রান।

রোববার (২ জুন) লন্ডনের দ্য ওভাল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় দুপুর সাড়ে তিনটায় শুরু হয় ম্যাচটি। ম্যাচটি সরাসরি সম্প্রচার করছে গাজী টিভি। বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ হলেও এটি দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় ম্যাচ। নিজেদের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের কাছে ১০৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরেছে প্রোটিয়ারা।

প্রোটিয়াদের বিপক্ষে দারুণ শুরু করেন দুই ওপেনার তামিম ইকবাল এবং সৌম্য সরকার। ইনিংসের নবম ওভারে বিদায় নেন তামিম। দলীয় ৬০ রানের মাথায় প্রথম উইকেট হারায় বাংলাদেশ। আন্দ্রেইল ফেলুকাওয়োর বলে খোঁচা দিতে গিয়ে উইকেটের পেছনে কুইন্টন ডি ককের গ্লাভসবন্দি হন তামিম। তার আগে ২৯ বলে দুটি চারের সাহায্যে করেন ১৬ রান। দলীয় ৭৫ রানের মাথায় বিদায় নেন আরেক ওপেনার সৌম্য সরকার। ক্রিস মরিসের ডেলিভারি সৌম্যর গ্লাভসে লেগে উইকেটের পেছনে চলে যায়। কুইন্টন ডি ককের গ্লাভসবন্দি হওয়ার আগে সৌম্য করেন ৪২ রান। ৩০ বলে সাজানো তার দারুণ ইনিংসে ছিল ৯টি বাউন্ডারি।

বিজ্ঞাপন
এরপর জুটি গড়েন সাকিব আল হাসান এবং মুশফিকুর রহিম। ব্যক্তিগত ৫ রান করে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটে ১১ হাজার রান স্পর্শ করেন সাকিব। ৭ ওভারে দলীয় ফিফটি আসলেও ১৬ ওভারে টাইগারদের দলীয় শতক আসে। সাকিব ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৪৩তম ফিফটি তুলে নেন, মুশফিক তুলে নেন ৩৪তম ফিফটি। এই দুই টাইগার পঞ্চমবারের মতো শত রানের জুটি গড়েন।

ইনিংসের ৩৬তম ওভারের প্রথম বলে বিদায় নেন সাকিব। ইমরান তাহিরের বলে বোল্ড হওয়ার আগে সাকিব করেন ৭৫ রান। সাকিব তার ৮৪ বলের ইনিংসে ৮টি চারের পাশাপাশি একটি ছক্কা হাঁকান। দলীয় ২১৭ রানের মাথায় বিদায় নেন সাকিব। সাকিব-মুশফিক জুটিতে আসে ১৪২ রান। যা বাংলাদেশের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড। গত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ গড়েছিলেন ১৪১ রানের জুটি।

ব্যাটিংয়ে নেমে বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান টানছিলেন মোহাম্মদ মিঠুন। ইনিংসের ৪০তম ওভারে ইমরান তাহিরের বলে বোল্ড হন তিনি। তার আগে ২১ বলে দুই চার আর একটি ছক্কায় ২১ রান করেন মিঠুন। দলীয় ২৪২ রানের মাথায় বাংলাদেশ চতুর্থ উইকেট হারায়। পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন রানমেশিন মুশফিকুর রহিম। ফেলুকাওয়োর বলে ডিপ পয়েন্টে ডুসেনের হাতে ধরা পড়ার আগে মুশফিক করেন ৭৮ রান। মিডলঅর্ডারের এই ব্যাটিং স্তম্ভ ৮০ বলে আটটি চার হাঁকান।

এরপর মোসাদ্দেককে সঙ্গে নিয়ে এগুতে থাকেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ইনিংসের ৪৯তম ওভারে বিদায় নেন মোসাদ্দেক। ফেলুকাওয়োর বলে ক্রিস মরিসের হাতে ধরা পড়ার আগে তিনি করেন ২০ বলে ২৬ রান। যেখানে ছিল চারটি চারের মার। ৩৩ বলে ৪৬ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ৩ বলে ৫ রান করে অপরাজিত থাকেন মেহেদি হাসান মিরাজ। ফেলুকাওয়ো, ক্রিস মরিস আর ইমরান তাহির দুটি করে উইকেট তুলে নেন।

৩৩১ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে নেমে ইনিংসের দশম ওভারে মেহেদি হাসান মিরাজের বল ঠিকমতো খেলতে পারেননি ওপেনার ডি কক। ক্যাচ উঠলেও মুশফিক বল গ্লাভসবন্দি করতে পারেননি। আইডেন মার্কারামের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন ডি কক। বল কুড়িয়ে স্ট্যাম্প ভেঙে দেন মুশফিক। বিদায়ের আগে ডি কক ৩২ বলে চারটি চারের সাহায্যে করেন ২৩ রান। দলীয় ৪৯ রানে প্রথম উইকেট হারায় প্রোটিয়ারা। এরপর ৫৩ রানের জুটি গড়েন দলপতি ফাফ ডু প্লেসিস এবং ওপেনার আইডেন মার্কারাম। ইনিংসের ২০তম ওভারে সাকিব বোল্ড করেন মার্কারামকে। দলীয় ১০২ রানের মাথায় প্রোটিয়ারা দ্বিতীয় উইকেট হারায়। বিদায়ের আগে মার্কারাম ৫৬ বলে চারটি চারের সাহায্যে করেন ৪৫ রান।

২৭তম ওভারে মিরাজের দুর্দান্ত এক ঘূর্ণিতে বোকা বনে যান প্রোটিয়া দলপতি ফাফ ডু প্লেসিস। বোল্ড হওয়ার আগে ৫৩ বলে ৫ চার আর এক ছক্কায় করেন ৬২ রান। ইনিংসের ৩০তম ওভারে সাকিবের বলে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন ডেভিড মিলার। সৌম্য সরকার লাফিয়ে ক্যাচটি লুফে নিতে পারেননি। ব্যক্তিগত ১৮ রানে জীবন পান কিলার মিলার। ব্যক্তিগত ৩২ রানের মাথায় মোস্তাফিজের বলে আবারো ক্যাচ তুলে দেন মিলার। থার্ডম্যানে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ক্যাচটি নিতে পারেননি। ৩৬তম ওভারে মোস্তাফিজের বলে মিরাজের তালুবন্দি হয়ে ফেরেন ডেভিড মিলার। ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে মিরাজের হাতে ধরা পড়ার আগে তিনি ৪৩ বলে দুই বাউন্ডারিতে করেন ৩৮ রান।

৩৮তম ওভারের প্রথম বলে মোস্তাফিজের ডেলভারি জেপি ডুমিনির প্যাডে লাগলে আম্পায়ার আউটের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। রিভিউয়ে বেঁচে যান ডুমিনি। ৪০তম ওভারের প্রথম বলে সাইফউদ্দিন বোল্ড করেন ভ্যান ডার ডুসেনকে। দলীয় ২২৮ রানের মাথায় পঞ্চম উইকেট হারায় প্রোটিয়ারা। ডুসেন সাজঘরে ফেরার আগে ৩৮ বলে দুই চার আর এক ছয়ে করেন ৪১ রান। ৪৩তম ওভারে সাইফ ফিরিয়ে দেন ফেলুকাওয়োকে। কভারে সাকিবের দুর্দান্ত এক ক্যাচে বিদায় নেওয়ার আগে তিনি করেন ১৩ বলে ৮ রান।

ইনিংসের ৪৬তম ওভারে মোস্তাফিজ ফিরিয়ে দেন ক্রিস মরিসকে। ডিপ মিড উইকেটে সৌম্যর হাতে ধরা পড়ার আগে তিনি ১০ বলে করেন ১০ রান। ইনিংসের ৪৮তম ওভারের প্রথম বলে ৪৫ রান করা জেপি ডুমিনিকে বোল্ড করেন মোস্তাফিজ। প্রোটিয়ারা দলীয় ২৮৭ রানে অষ্টম উইকেট হারায়।

মিরাজ ১০ ওভারে ৪৪ রান দিয়ে তুলে নেন একটি উইকেট। সাকিব ১০ ওভারে ৫০ রান দিয়ে তুলে নেন একটি উইকেট। আর এই এক উইকেটের মধ্যদিয়ে সাকিব গড়েন দারুণ এক কীর্তি। ২০০ ওয়ানডে ম্যাচের কম খেলে ২৫০ উইকেট সঙ্গে ব্যাট হাতে ৫ হাজার রানের বিরল এক রেকর্ড গড়েন সাকিব। সাইফউদ্দিন ৮ ওভারে ৫৭ রান দিয়ে তুলে নেন দুটি উইকেট। মাশরাফি ৬ ওভারে ৪৯ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। মোসাদ্দেক ৬ ওভারে ৩৮ রান দিয়ে উইকেট শূন্য থাকেন। মোস্তাফিজ ১০ ওভারে ৬৭ রান দিয়ে পান ৩ উইকেট।

আইসিসির প্রকাশিত সবশেষ র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের থেকে এগিয়ে অবস্থান দক্ষিণ আফ্রিকা। বাংলাদেশের থেকে চার ধাপ এগিয়ে প্রোটিয়াদের অবস্থান তৃতীয় স্থানে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান সাত নম্বরে। প্রোটিয়াদের রেটিং পয়েন্ট ১১৫, টাইগারদের রেটিং পয়েন্ট ৯০। তবে র‌্যাংকিং কিংবা অতীত দিয়ে বিশ্বকাপে কোনো দলকে বিচার করা হয় না সেটি প্রমাণ করলো টাইগাররা। মহারণের মাঠে ব্যাট-বলে পারফর্ম করে ম্যাচ জিততে হয় সব দলকেই। মাঠের লড়াইয়ে এখন আর পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দৃঢ়। বিশ্ব ক্রিকেটের পরশক্তিদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করে টাইগাররা। লড়াইয়ে যে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই তা পরিষ্কার আয়ারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজেই।

বিশ্বকাপে হেড টু হেড মোট ম্যাচ: ৪টি, বাংলাদেশ জয়ী: ২টি। দক্ষিণ আফ্রিকা জয়ী: ২টি। মুখোমুখি দুই দল মোট ম্যাচ: ২১টি। বাংলাদেশ জয়ী: ৪টি। দক্ষিণ আফ্রিকা জয়ী: ১৭টি। ড্র: ০টি ম্যাচ পরিত্যক্ত: ০টি।