যেভাবে গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়ে ওসি মোয়াজ্জেম। বিস্তারিত

রবিবার, জুন ১৬, ২০১৯ ৫:১৫ অপরাহ্ণ

সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় গত ২৭ মে। এরপর ১৬ জুন পর্যন্ত ঢাকা, ফেনী, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েও তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত রোববার (১৬ জুন) দুপুরে তাকে শাহবাগ থানা পুলিশ গ্রেফতার করেছে শাহবাগ এলাকা থেকেই। গোয়েন্দা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জামিনের জন্য হাইকোর্টে এসে পুলিশের কাছে ধরা পড়েছেন মোয়াজ্জেম।

ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতারের পর শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা শাহবাগ থানা এলাকা থেকে পুলিশ পরিদর্শক মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করেছি। তাকে শাহবাগ থানায় রাখা হয়েছে।’

ঠিক কোন জায়গা থেকে মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে বলেননি ওসি। তবে শাহবাগ থানা পুলিশেরই আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, হাইকোর্টের সামনে থেকে বিকেল ৩টার দিকে গ্রেফতার করা হয় মোয়াজ্জেমকে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও পুলিশ পরিদর্শক মোয়াজ্জেম হোসেনের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেও একই তথ্য পাওয়া গেছে।

গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের চারটি টিম নিবিড়ভাবে কাজ করেছে। তাদের কাছে তথ্য ছিল, মোয়াজ্জেম গত কয়েকদিন ধরে কুমিল্লায় অবস্থান করছেন। সেই তথ্য অনুযায়ী গত চার দিনে কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালান গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা।

ডিবি পুলিশের একজন কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, গত চার দিন ধরে কুমিল্লা শহর, মুরাদনগর, দেবিদ্বার ও দাউদকান্দি— এই চার এলাকায় মোয়াজ্জেমের শ্যালিকা, বন্ধু, খালাত বোন ও গাড়িচালকের বাসায় অভিযান চালিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। আমাদের কাছে তথ্য ছিল, এই প্রতিটি স্থানেই মোয়াজ্জেম অবস্থান করেছে। কিন্তু অভিযানে তাকে ধরা সম্ভব হয়নি।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ফোন নম্বর ট্র্যাকিং মোয়াজ্জেমের ফোনে অবস্থান নির্ণয় করা গেলেও গ্রেফতার এড়াতে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন তিনি। নিজের ফোনটি অন্যের কাছে দিয়ে রেখেছিলেন। ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, আমরা ফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে একজনকে ধরেও ফেলি। কিন্তু দেখা যায়, ফোনটি যার কাছে আছে, তিনি মোয়াজ্জেম নন।

তবে তাতে দমে যাননি গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা। ওসি মোয়াজ্জেমের সঙ্গে যত জনের কথা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ফোন নম্বর ট্র্যাকিং করে তার অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করে ডিবি। একইসঙ্গে ডিবির এই তৎপরতার কারণে মোয়াজ্জেমও স্থান থেকে স্থানে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হন। একইসঙ্গে ডিবি কর্মকর্তারা মোয়াজ্জেমের স্বজনদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। মোয়াজ্জেমের স্ত্রী, শ্বশুরবাড়ির স্বজন ও প্রশাসনে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা শেষ পর্যন্ত মোয়াজ্জেমকে জামিনের জন্য হাইকোর্টে আসতে বাধ্য করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, আমরা খবর পাই, আজ (রোববার) মোয়াজ্জেম জামিন নিতে হাইকোর্টে আসবেন। সে কারণে আমরা হাইকোর্টে তৎপর ছিলাম। তবে তিনি কোন আইনজীবীর দ্বারস্থ হবেন, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। ফলে হাইকোর্টের প্রতিটি আইনজীবীর চেম্বার আমাদের খুঁজে দেখতে হয়েছে। গোটা এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছিল। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়েই শেষ পর্যন্ত মোয়াজ্জেম হাইকোর্টের বাইরে বের হতে বাধ্য হয়। আর সেখান থেকেই শাহবাগ থানা পুলিশ গ্রেফতার করে তাকে।

গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে মোয়াজ্জেম এ কয়দিন দাঁড়ি ও গোঁফ কাটেননি। ফলে স্বাভাবিকভাবে তাকে চিনতে সমস্যাই হওয়ার কথা। তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসী ধরা সহজ। কিন্তু পুলিশের কাউকে ধরা যে এত কঠিন সেটা ওসি মোয়াজ্জেমকে ধরতে গিয়ে বুঝতে পেরেছি। কারণ পুলিশ জানে, পুলিশের চোখ কিভাবে ফাঁকি দিতে হয়।

কুমিল্লার মুরাদনগরে থাকেন মোয়াজ্জেম হোসেনের খালাত ভাই খায়রুল ইসলাম মিনহাজ। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, আজ (রোববার) সকাল ১০টায় জামিন আবেদন নিয়ে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামের মাধ্যমে হাইকোর্টে ২৫ নম্বর কোর্টে হাজির হন মোয়াজ্জেম। আদালত জামিন শুনানির জন্য আগামীকাল সোমবার (১৭ জুন) তারিখ নির্ধারণ করেন। পরে হাইকোর্ট এলাকা থেকেই তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

মোয়াজ্জেমের দীর্ঘ দিনের গাড়িচালক মো. জাফর সারাবাংলাকে বলেন, মোয়াজ্জেমের ফোন পেয়ে সকালে কুমিল্লা থেকে ঢাকা এসেছেন। আসার পর থেকেই মোয়াজ্জেমের সঙ্গে ছিলেন তিনি। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

জাফর জানান, গত ২৭ মে মোয়াজ্জেমের সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। মোয়াজ্জেম ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন বলে শুনেছেন। তবে সীমান্তে কড়া নিরাপত্তার কারণে মোয়াজ্জেম সফল হননি বলেও জানতে পারেন। তবে গত পাঁচ দিনে মোয়াজ্জেমের সঙ্গে তার পরিবারের কারও কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি বলে দাবি করেন জাফর।

তিনি বলেন, এরপর আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, তিনি (মোয়াজ্জেম) ভারতে চলে গিয়েছেন। আজকে ফোন পেয়ে সে ধারণা পাল্টে যায়। পরে ঢাকা চলে আসি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে ধরা পড়লেন তিনি।

অধ্যক্ষের কাছে শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে থানায় অভিযোগ দিতে গিয়েছিলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি। ওই সময় নুসরাতের জবানবন্দি ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম। থানায় নুসরাতকে হয়রানির এ ঘটনায় ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে বাদি হয়ে মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

আদালত মামলাটির তদন্ত ভার দেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। পরে গত মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা তুলে ধরে ২৭ মে পিবিআইয়ের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকেই অভিযান চালিয়েও মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ফেনী ও ঢাকায় বারবার অভিযান চালিয়েও খুঁজে পাওয়া যায়নি তাকে। ফেনী জেলা পুলিশ ঢাকায় এসেও অভিযান চালিয়েছে। তবে মোয়াজ্জেমের কোনো হদিস তারা বের করতে পারেনি।

সাময়িক বরখাস্ত করার পর মোয়াজ্জেমকে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি অফিসে সংযুক্ত করা হয়। সেখানেও পাঠানো হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা। তবে মোয়াজ্জেম সেখানে যোগ না দেওয়ায় সেখান থেকেও তাকে গ্রেফতার করা যায়নি।

এর আগে, নুসরাত থানায় গিয়ে ওসি মোয়াজ্জেমের কাছে হয়রানির শিকার হলেও পরে তার মা নুসরাতের মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, সিরাজকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় নুসরাতের মা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন।

এরপর থেকেই সিরাজ কারাগারে রয়েছেন। তবে কারাগার থেকেই তিনি নুসরাতের পরিবারের ওপর মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। নুসরাতের পরিবার মামলা তুলে না নিলে সহযোগীদের দিয়ে ৬ এপ্রিল গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় অধ্যক্ষের সহযোগীরা। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল না ফেরার দেশে পাড়ি জমান নুসরাত।সূত্র:সারাবাংলা